নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও করণীয়

নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখলে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি খুব গুরুতর কোনো সমস্যা নয়। মেডিকেলের ভাষায় এই সমস্যাটিকে ‘এপিস্ট্যাক্সিস’ (Epistaxis) বলা হয়। মূলত নাকের ভেতরের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ফেটে গেলে এই রক্তপাতের সৃষ্টি হয়।

যদিও সাধারণ কারণে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্য নিয়ে হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

ক্ষেত্রবিশেষে এটি উচ্চ রক্তচাপ বা শরীরের ভেতরের কোনো বড় রোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ, এর লক্ষণ এবং দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করার উপায় বা করণীয় সম্পর্কে আমাদের সবারই সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন।

নাক দিয়ে রক্ত পড়া কত ধরনের হয়?

নাক দিয়ে রক্ত পড়া মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে

১. সামনের দিকের রক্তপাত (Anterior Epistaxis)
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। নাকের সেপ্টামের সামনের অংশ থেকে এই রক্তপাত হয়। এটি সাধারণত বাড়িতেই সামলানো যায় এবং তেমন বিপজ্জনক নয়।

২. পেছনের দিকের রক্তপাত (Posterior Epistaxis)
এটি তুলনামূলক গুরুতর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। নাকের গভীরে, গলার কাছের বড় রক্তনালি থেকে এই রক্তপাত হয়। রক্ত গলা দিয়েও নামতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সময় সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, তা হলো:

  • এক বা উভয় নাকের ছিদ্র দিয়ে তাজা রক্ত ঝরা।
  • নাকের ভেতরে অস্বস্তি, সুড়সুড়ি বা সামান্য ব্যথা অনুভব করা।
  • রক্ত গলার পেছনের অংশে চলে যাওয়ার অনুভূতি বা গলায় রক্তের স্বাদ পাওয়া।
  • অতিরিক্ত রক্তপাতের ক্ষেত্রে বা গুরুতর অবস্থায় মাথা ঘোরা, শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

কেন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে?

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার পেছনে একটি-দুটি নয়, বরং অনেক কারণ থাকতে পারে। সাধারণ কোনো অভ্যাস থেকে শুরু করে শরীরের ভেতরের জটিল কোনো সমস্যা — সব ধরনের কারণই এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণ কারণগুলো:

  • শুষ্ক আবহাওয়া: শীতকালে বা শুষ্ক পরিবেশে নাকের ভেতরের ঝিল্লি শুকিয়ে ফেটে যায়, যা থেকে খুব সহজেই রক্তপাত হতে পারে।
  • নাকে আঙুল দেওয়া: বারবার নাকে আঙুল দেওয়ার অভ্যাস রক্তনালিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
  • জোরে নাক ফোঁকা: সর্দি বা অ্যালার্জির কারণে অতিরিক্ত চাপে জোরে নাক ফুঁকলে নাকের ভেতরের নরম রক্তনালি ফেটে যেতে পারে।
  • ঠান্ডা বা সংক্রমণ: সাইনাস ইনফেকশন, অ্যালার্জি বা ঠান্ডা লাগার কারণে নাকের ভেতরে প্রদাহ হলে রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যান্য কারণ:

  • আঘাত বা দুর্ঘটনা: মুখে বা নাকে সরাসরি কোনো আঘাত লাগলে রক্তপাত হতে পারে।
  • বায়ুচাপের পরিবর্তন: বিমান ভ্রমণের সময় বা অনেক উঁচুতে (পাহাড়ে) গেলে হঠাৎ বায়ুচাপের পরিবর্তনের কারণে এমনটা হতে পারে।
  • ওষুধের প্রভাব: রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন: অ্যাসপিরিন) বা নাকের স্টেরয়েড স্প্রে অতিরিক্ত ব্যবহার করলে।
  • ধূমপান: অতিরিক্ত ধূমপান নাকের ভেতরের নরম আবরণকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত ও শুষ্ক করে তোলে।
  • লিভারের সমস্যা: লিভার বা যকৃতের রোগ শরীরের রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
  • রক্তের ব্যাধি: হিমোফিলিয়া বা প্লেটলেট ডিসঅর্ডারের মতো রক্ত জমাট বাঁধার কোনো জেনেটিক বা শারীরিক সমস্যা থাকলে।
  • ক্যান্সারের চিকিৎসা: ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে রক্তপাত হতে পারে।
  • মাদক সেবন: নাক দিয়ে কোকেনের মতো ক্ষতিকর মাদক গ্রহণ করলে নাকের ভেতরের টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • বস্তু ঢুকে যাওয়া: বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নাকে ছোট কোনো বস্তু বা খেলনার অংশ ঢুকে গেলে রক্তপাত হতে পারে।
নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ
নাক দিয়ে রক্ত পড়া: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?

কিছু সহজ ও দৈনন্দিন অভ্যাস মেনে চললে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব:

  • স্যালাইন স্প্রের ব্যবহার: নাকের ভেতরটা আর্দ্র রাখতে দিনে ২-৩ বার স্যালাইন নেজাল স্প্রে (Saline nasal spray) ব্যবহার করুন।
  • হিউমিডিফায়ার ব্যবহার: বিশেষত শীতকালে বা শুষ্ক পরিবেশে ঘরের বাতাস আর্দ্র রাখতে হিউমিডিফায়ার (Humidifier) ব্যবহার করুন।
  • জোরে নাক না ফোঁকানো: সর্দি মুছতে খুব জোরে বা অতিরিক্ত চাপে নাক ফোঁকানো থেকে বিরত থাকুন।
  • হাঁচির সময় মুখ খোলা রাখা: হাঁচির সময় মুখ খোলা রাখলে নাকের ওপর বাতাসের চাপ কম পড়ে, ফলে রক্তনালি সুরক্ষিত থাকে।
  • নাকে আঙুল না দেওয়া: নাকে আঙুল দেওয়া বা শক্ত কোনো বস্তু ঢোকানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন।
  • শিশুর নখ কাটা: বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত নখ ছোট রাখুন, যাতে তারা অজান্তে নাকের ভেতর ক্ষত সৃষ্টি করতে না পারে।
  • ধূমপান বর্জন: ধূমপান নাকের ভেতরের পরিবেশ শুষ্ক করে ফেলে, তাই এটি পরিহার করুন।
  • প্রতিরক্ষামূলক গিয়ার: খেলাধুলা বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় নাকে আঘাত এড়াতে হেলমেট বা ফেস গার্ড ব্যবহার করুন।
  • ওষুধ গ্রহণে সতর্কতা: অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করে এমন কোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না।

উপসংহার

নাক দিয়ে রক্ত পড়া বেশিরভাগ সময়ই ভয়ের কারণ নয়। কিন্তু এটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যদি ঘন ঘন বা মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তাহলে অবশ্যই একজন ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন — কারণ সময়মতো চিকিৎসাই পারে বড় সমস্যা থেকে আপনাকে রক্ষা করতে।

নাক দিয়ে রক্ত পড়লে তাৎক্ষণিক করণীয় কী?

নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে সোজা হয়ে বসুন এবং মাথা সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখুন। এরপর নাকের নরম অংশে (হাড়ের ঠিক নিচে) আঙুল দিয়ে ১০-১৫ মিনিট একটানা চাপ দিয়ে ধরুন এবং মুখ দিয়ে শ্বাস নিন। প্রয়োজনে নাকের ওপর বরফের সেঁক দিতে পারেন।

রক্ত পড়া বন্ধ করতে মাথা কি পেছনের দিকে হেলানো উচিত?

না, মাথা কখনোই পেছনের দিকে হেলানো উচিত নয়। এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। মাথা পেছনে হেলালে রক্ত গলার ভেতর দিয়ে পেটে চলে যেতে পারে, যার ফলে বমি ভাব বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। মাথা সবসময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে রাখতে হবে।

শীতকালে বেশি নাক দিয়ে রক্ত পড়ে কেন?

শীতকালে পরিবেশের বাতাস অনেক শুষ্ক থাকে। শুষ্ক আবহাওয়ায় নাকের ভেতরের আর্দ্র ঝিল্লি (মিউকাস মেমব্রেন) দ্রুত শুকিয়ে যায়। ফলে নাকের ভেতরটা ফেটে গিয়ে খুব সহজেই রক্তপাত শুরু হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure) থাকলে কি নাক দিয়ে রক্ত পড়ে?

উচ্চ রক্তচাপ সরাসরি নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রধান কারণ নয়। তবে যাদের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে তা সহজে বন্ধ হতে চায় না এবং অতিরিক্ত রক্তপাতের ঝুঁকি থাকে।

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার চিকিৎসার জন্য কোন ডাক্তারের কাছে যাব?

সাধারণ রক্তপাত বাড়িতেই বন্ধ করা যায়। তবে নাক দিয়ে ঘন ঘন রক্ত পড়লে বা ১৫-২০ মিনিটেও রক্ত পড়া বন্ধ না হলে একজন ইএনটি (ENT – নাক, কান ও গলা) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top