ফোড়া (Boil) মূলত আমাদের ত্বকের লোমকূপ বা তৈল গ্রন্থি যখন এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়, তখন তৈরি হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কিছু দেশের মানুষ এই রোগের প্রতি বেশি পরিমাণে অ-সচেতন থাকায় এটি বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়।
অনেকে ফোড়াকে শরীরের জন্য উপকারী মনে করেন। তবে এটি অনেক যন্ত্রনাদায়ক তা আর বলতে বাদ রাখে না। কিন্তু অনেকে এটিকে উপকারী না বলেই সরাসরি ধরে নেন। আসলে ফোড়া সরাসরি শরিরে উপকার করতে পারে না। কিন্তু ফোড়া মূলত বুঝিয়ে দিতে পারে যে – আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো সংক্রিয় রয়েছে ফলে ব্যাক্টেরিয়া শরিরের গহীনে প্রবেশ করতে পারেনি আর ফোড়া জন্ম নিয়েছে।
যেহেতু ফোড়া একটি নানামুখী রোগ, এই রোগের বিভিন্ন ধরন থাকে, তাই আমরা এই ফোড়া সংক্রান্ত একটি ক্যাটাগরি তৈরি করেছি। সেখানে আমরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ধরনের ফোড়া সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করি।
আমরা আজ আপনাদের জন্য ফোড়া শক্ত হওয়ার কারন বা ফোড়া না পাকার কারন এবং ফোড়া শক্ত হলে করণীয় কি এবং কি ধরনের ওষুধ খাওয়া যেতে পারে বা কি ধরনের থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে তা সমন্ধে আলোচনা করতে চাই।
ফোড়া শক্ত হয়ে যাওয়া বা না পাকার কারণ
ফোড়া শক্ত হয়ে যাওয়া বা না পাকার পেছনে বেশ কিছু শারীরিক ও জৈবিক কারণ থাকে। তার মধ্যে অন্যতম কারণগুলো আমরা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
- যদি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ত্বকের অনেক গভীরে হয়, তবে সেটি সহজে চামড়ার ওপরের দিকে আসতে পারে না। ফলে পুঁজ তৈরি হলেও তা ভেতরেই থেকে যায় এবং বাইরের চামড়া শুধু লাল ও শক্ত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ফোড়া ভেতরগত ভাবে অনেক সময় পেকে থাকলেও উপরে বেশ শক্ত অনুভব হয় এবং ফেটে যায় না।
- কখনো কখনো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতই শক্তিশালী হয় যে, তারা ব্যাকটেরিয়াকে চারপাশ থেকে খুব শক্তভাবে ঘিরে ফেলে। ফলে এটি বেশ শক্ত হয়ে জমাট বেধে থাকে।
- অনেকের শরিরের টিস্যু তুলনামূলক মোটা হয়, এমন কি বিশেষ স্থানের চামড়াও দেহের সাধারন স্থানের চেয়ে মোটা হতে পারে, ফলে সেটি ও বেশ শক্ত হয় এবং তার জন্যেও ফোড়া পাকতে দেরি করতে পারে বা শক্ত চামড়া উপরে থাকায় মুখ দেখা যেতে নাও পেতে পারেন।
- যদি আক্রান্ত স্থানে রক্ত চলাচল কম হয় , তবে সেখানে শ্বেত রক্তকণিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছাতে পারে না। ফলে পুঁজ হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ফোড়া দীর্ঘ সময় শক্ত থাকে। অনেক সময় এই ধরনের সমস্যা ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
ফোড়া শক্ত হলে করণীয়
ফোড়া হলে সর্বদাই আমরা চাই সেটি যেন দ্রুত নরম হয়ে পেকে যায় এবং ভেতরে থাকা ময়লা, পচা রক্ত বা পুজ দ্রুত বেরিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়।
ফোড়া সাধারনত দুই ভাবে শক্ত বোধ হতে পারে
- একবার পেকে তার পরে অল্প ময়লা সহ শক্ত হয়ে যাওয়া
- নতুন অবস্থাতেই শক্ত হয়ে থাকা
নতুন অবস্থাতেই ফোড়া শক্ত হয়ে থাকা
ফোড়া শক্ত হয়ে থাকা মানে হলো এটি এখনও ‘পরিপক্ক’ হয়নি বা ভেতরে পুঁজ জমে চামড়ার ওপরের দিকে আসার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি। এমন অবস্থায় ব্যাথা হওয়া বা বিরক্ত বোধ করা সাভাবিক। এক্ষেত্রে দ্রুত পাকাতে বা ব্যাথা কমাতে বাজারে থাকা কিছু ওষুধ সেবন করা যেতে পারে বা ঘরোয়া উপায়েও ফোড়া পাকানো যেতে পারে।
একবার ফোড়া পাকার পরে শক্ত অবস্থার কারন
সাধারন নিয়ম অনুযায়ী ফোড়া পাকার পরে সেখান থেকে ময়লা বা পচা রক্ত বেড়িয়ে গেলে সেটি শক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যখন এমন হয় যে সেটি ময়লা অবস্থাতেই শক্ত হয়ে যাচ্ছে তখন সেটি ক্ষতিকর।
এর কারণ হতে পারে যে আপনি অবহেলায় সেটি সঠিক ভাবে পরিষ্কার করেন নি। বা প্রয়োজনীয় ডাক্তারের কাছে গিয়ে ড্রেসিং করান নি।
নোটঃ ভালো খবর এই যে, যে কারনেই শক্ত হোক না কেন, সেটি নরম করা বা পাকানোর ব্যবস্থা একই রকম থাকে। তাই চিন্তার কারণ নেই, বরং সঠিক সিদ্ধান্তে যাওয়া দরকার।
ফোড়া নরম করা আর পোড়া পাকানো একই কথা। তাই আমরা ফোড়া নরম করার বিষয়টি ফো়ড়া পাকানোর বিষয়ে চন্তা করবো। কারণ ফোড়া পেকে গেলেই সেটি সেরে উঠবে।
ফোড়া পাকানোর উপায়গুলো কি কি
আমরা ফোড়া পাকানোর উপায়কে দুই ভাবে চিন্তা করতে পারি।
- চিকিৎসা বিজ্ঞান
- ঘরোয়া বা প্রাচীন উপায়
আমরা একটা একটা করে উভয় বিষয়ে আলোচনা করবো। তবে কোন প্রকারের ওষুধ নিজের ইচ্ছায় সেবন করা ঠিক হবে না। ওষুধ সেবনের আগে ডাক্তারের পরামর্শ বাধ্যতামূলক।
ফোড়া পাকানোর ওষুধ
ফোড়া দ্রুত পাকানোর কিছু মলম, ওষুধ এবং থেরাপি রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বিষয়গুলো একটা একটা করে আলোচনা করাই ভালো।
ফোড়া পাকানোর মলম এর তালিকা
বাংলাদেশের ফার্মেসিতে সহজেই যে সকল ফোড়া পাকানোর মলম পাওয়া যায়, তার তালিকায় সেরা কিছু মলম এখানে দেওয়া হলো।
- ইকথায়ল মলম
- ম্যাগনেসিয়াম সালফেট পেস্ট
এগুলো সামান্য পরিমাণে ফোড়ার গায়ে লাগিয়ে রাখতে হয়। ফলে উপরের ভাগে থাকা পানি চুষে নেয় এবং চুম্বকের মতো ভেতরে থাকা পুজকে পাকিয়ে উপরের দিকে টেনে আনে। ফলে দ্রুত ফোড়া পেকে যায়। এক্ষেত্রে উপরে এক টুকরো গজ দিয়ে ঢেকে রাখা ভালো, ফলে মাছি বা এজাতিয় প্রানীর দ্বারা সংক্রমিত হয় না।
চিকিৎসা থেরাপী
অতিরিক্তমাত্রায় ফোড়ার বেহাল অবস্থা দেখা গেলে ইনসিশন অ্যান্ড ড্রেনেজ করা যেতে পারে। এটি এক প্রকারের ক্লিনিক থেরাপী। এই থেরাপীকে সংক্ষেপে এক প্রকারের সার্জারী ও বলতে পারেন। এটি ছোট্র ছিদ্র করার মাধ্যমে ভেতর থেকে পুজ বের করা হয়। এক্ষেত্রে আগে ও পরে কিছু বিশেষ ওষুধ বা ইনজেকশন প্রয়োজন হতে পারে।
ফোড়া পাকানোর ওষুধ
ফোড়া পাকানোর জন্য এবং এর ব্যাথা নাশক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ওষুধ দেওয়া হতে পারে, যা উক্ত ফোড়ার পরিচ্ছিতির উপরে নির্ভর করে প্রদান করা হবে।
আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কিছু ওষুধের তালিকা করে দিচ্ছি। তবে আপনি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ওষুধ শেবন করবেন।
- ফ্লুক্লক্সাসিলিন
- সেফালেক্সিন
- অ্যাজিথ্রোমাইসিন
এছাড়াও ব্যাথা নাশক হিসেবে প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন বা ন্যাপ্রোক্সেন এর মতো বিশেষ ওষুধ দেওয়া হতে পারে। এমন কি কখনো কখনো শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ও দেওয়া হয় যাতে না অন্য দিকে রোগ মোড় নিতে পারে।
ফোড়া পাকানোর ঘরোয়া উপায়
ঘরোয়া বা প্রাচীন কিছু উপায়েও ফোড়া পাকানোর রীতি প্রচলিত রয়েছে। তবে বিজ্ঞানের শক্ত ভ্যালু থাকতেও কেন প্রাচীন উপায়ে যেতে হবে বলুন। আমরা বলি আপনি ডাক্তারের সরাপর্ন হয়ে ভালো চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
ঘরোয়া উপায়ে বিশেষ বিশেষ কিছু জিনিসের ব্যবহারে ফোড়া পাকানো সম্ভব হয়। যা প্রাশয় হাতের কাছে পাওয়া যায়। আমরা সেগুলো সমন্ধেও তথ্য সাজিয়েছি।
- একটি পান পাতায় সামান্য ক্যাস্টর অয়েল বা সরিষার তেল মাখিয়ে হালকা গরম করে ফোড়ার ওপর রেখে একটি কাপড় দিয়ে বেঁধে দিন। এভাবে কয়েকবার করতে থাকুন।
- তাজা নিম পাতা বেটে পেস্ট তৈরি করুন। পেস্টটি সরাসরি ফোড়ার ওপর লাগিয়ে রাখুন।
- কাঁচা হলুদ ও আদা একসাথে বেটে সামান্য গরম করে নিন। মিশ্রণটি ফোড়ার ওপর প্রলেপ হিসেবে লাগান।
- সামান্য ময়দা বা আটার সাথে সরিষার তেল এবং এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে একটি ছোট মণ্ড তৈরি করুন।
- হালকা গরম করে ফোড়ার ওপর বসিয়ে দিন এবং উপরে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখুন।
এই সকল উপায়েও ঘরে বসেই দারুন কাজ করে ফোড়া সহজেই পাকিয়ে ফেলতে পারেন। তার সাথে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই চুনের ব্যবহার দেখি। চুনে থাকা ক্ষারের কারনে এটি ঝাঝ পায়, ফলে দ্রুত পেকে যায়। তবে বিজ্ঞান এটিকে বেশ কিছুটা সতর্ক বার্তা দিয়ে থাকে। কারণ অনেকের ত্বক নরম থাকলে সেটি পুড়ে যেতে পারে।
শেষ কথা
ফোড়া সংক্রান্ত আমাদের করা বিশেষ ক্যাটাগরিতে আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের ফোড়া নিয়ে আলোচনা করবো। সেই সাথে আমরা ফোড়া ভালো করা বা ফোড়ার বিভিন্ন অবস্থা যেমন ফোড়া শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ে আলোচনা করবো। তাই আপনার কোন ফোড়া সংক্রান্ত তথ্য জানার থাকলে আমাদের ক্যাটাগরিতে যেতে ভুলবেন না।
আমাদের এই সাইটে আমরা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিশেষ সকল তথ্যের আলোচনা করবো। তাই আমাদের সাইট কে ভালো করে মনে রাখতে পারেন।